খেজুরের রস খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতা
খেজুরের রস খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতা সম্পর্কে আজকের এই আর্টিকেলে বিস্তারিত আলোচনা করার চেষ্টা করব। যারা খেজুরের রসের উপকারিতা ও অপকারিতা সম্পর্কে জানেন না তাদের জন্য আজকের এই আর্টিকেল উপকারী হবে বলে আশা করছি। শীতকালে গ্রাম বাংলার মানুষের জন্য খেজুরের রস একটি মজাদার পানীয়।
শীতের সকালে একগ্লাস খেজুরের ঠান্ডা ও টাটকা রস খেতে পছন্দ করেন না এমন মানুষ খুব কমই আছে। খেজুরের রস খেতে যেমন মজা তেমনি রয়েছে পুষ্টিগুণ। খেজুরের রসে যেমন উপকারিতা রয়েছে তেমনি এর কিছু অপকারিতা রয়েছে। চলুন তাহলে জেনে নেওয়া যাক খেজুরের রস খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতা সম্পর্কে।
পোস্ট সূচিপত্রঃ খেজুরের রস খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতা
- খেজুরের রস কি?
- খেজুরের রস খাওয়ার উপকারিতা
- ক্লান্তি ভাব দূর করে ও শরীরের শক্তি যোগায়
- খেজুরের রস রক্ত সল্পতা পূরণ করে
- হজম শক্তি বাড়ায় ও কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে
- খেজুরের রস রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে
- খেজুরের রস হাড় ও পেশিকে মজবুত করে
- ভিটামিনের অভাব দূর করে ও ত্বক ভালো রাখে
- ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকে ও রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়
- খেজুরের রসের অপকারিতা
- FAQ: বহু জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন ও উত্তর
- শেষ কথাঃ খেজুরের রস খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতা
খেজুরের রস কি?
খেজুরের রস খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতা সম্পর্কে জানার আগে জানতে হবে খেজুরের রসটা আসলে কি? খেজুর গাছের কান্ড কেটে পানি আকৃতির যে স্বচ্ছ ও মিষ্টি প্রাকৃতিক রস সংগ্রহ করা হয় তাই হল খেজুরের রস। সাধারণত শীতকালে বিশেষ করে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত এ খেজুরের রস সংগ্রহ করা হয়।
কাঁচা অবস্থায় এ রস খেতে স্বচ্ছ ও মিষ্টি লাগে। জাল দিলে খেজুরের রস লাল আকৃতির
আঠালো হয়ে যায় যা খেতে আরো মিষ্টি ও সুস্বাদু। খেজুরের রস থেকে গুড় বা পাটালি
তৈরি হয়। খেজুরের রস বা গুড় দিয়ে নানা রকম পিঠা পায়েস তৈরি হয়, যা খেতে
অনেক বেশি মজাদার।
খেজুরের রস খাওয়ার উপকারিতা
খেজুরের রস বেশ উপকারী একটি পানীয়। খেজুরের রস খেলে শরীরে শক্তি আসে। যেকোন কৃত্রিম এনার্জি ড্রিংক এর চেয়ে খেজুরের রস অনেক বেশি উপকারী ও স্বাস্থ্যসম্মত। তাই খেজুরের রস কে প্রাকৃতিক এনার্জি ড্রিংক বলা হয়। খেজুরের রসে রয়েছে ভিটামিন, ক্যালসিয়াম ও বিভিন্ন খনিজ উপাদান।
খেজুরের রস কাঁচা খাওয়া যতটা উপকারী তার চেয়ে জাল দিয়ে বা গুড় বানিয়ে খাওয়া
বেশি উপকারী। আখের গুড়ের চেয়ে খেজুরের রসের গুড়ের পুষ্টি ও স্বাদ অনেক বেশি।
চলুন তাহলে খেজুরের রস খাওয়ার উপকারিতা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা
যাক।
ক্লান্তি ভাব দূর করে ও শরীরের শক্তি যোগায়
খেজুরের রস খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতা নিয়ে আলোচনায় এখন আলোচনা করব খেজুরের রসের উপকারিতা নিয়ে। খেজুরের রস ক্লান্তি ভাব দূর করে ও শরীরে দ্রুত শক্তি যোগায়। খেজুরের রসে রয়েছে প্রাকৃতিক চিনি ও শর্করা। ফলে এক গ্লাস খেজুরের রস পান করলে শরীরে ক্লান্তি দূর হয় ও দ্রুত শরীরের শক্তি আসে।
এছাড়া খেজুরের রসে রয়েছে ম্যাগনেসিয়াম। ম্যাগনেসিয়াম এর অভাবে শরীরে
ক্লান্তি ভাব আসে। যেহেতু খেজুরের রসে প্রচুর ম্যাগনেসিয়াম রয়েছে তাই খেজুরের
রস পান করলে ম্যাগনেশিয়ামের অভাব দূর হয়ে শরীরে ক্লান্তি ভাব দূর হয় ও শরীরে
সজীবতা ফিরে আসে।
আরও পড়ুনঃ শীতের লোভনীয় কয়েকটি পিঠার সহজ রেসিপি
খেজুরের রস রক্ত সল্পতা পূরণ করে
খেজুরের রস দিয়ে তৈরি গুড় বা লালিতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে আয়রন যা
রক্তস্বল্পতা পূরণে সাহায্য করে। খেজুরের রসে থাকা আয়রন রক্তে হিমোগ্লোবিনের
মাত্রা বৃদ্ধি করে ও অ্যানিমিয়া রোগের ঝুঁকি কমায়। প্রতিদিন এক টুকরা
খেজুরের রসের তৈরি গুড় খেলে রক্তস্বল্পতার হাত থেকে মুক্তি মিলতে পারে।
বাংলাদেশের মানুষ প্রতিবছর শীতকালে প্রচুর খেজুর রস ও খেজুরের রস দ্বারা তৈরি
বিভিন্ন খাবার খেয়ে থাকে। যার ফলে অনেক মানুষ রক্ত স্বল্পতার হাত থেকে রক্ষা
পায়।
হজম শক্তি বাড়ায় ও কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে
খেজুরের রস খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতা সম্পর্কে আলোচনায় এখন আলোচনা করব খেজুরের রস কিভাবে হজম শক্তি বাড়ায় ও কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে সে সম্পর্কে। খেজুরের রসে রয়েছে ফাইবার বা আঁশ যা হজম শক্তি বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। পেট ফাঁপা, বদহজম প্রভৃতি সমস্যা দূর করতে সাহায্য করে।
যেহেতু খেজুরের রসে ফাইবার রয়েছে তাই এটি কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতেও
সাহায্য করে। প্রতিদিন খাবারের পর পরিমাণ মতো খেজুরের রস অথবা এক টুকরো
খেজুরের রসের তৈরি গুড় খেলে দ্রুত খাবার হজম করতে সাহায্য করবে।
খেজুরের রস রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে
খেজুরের রসের আরেকটি বড় উপকারিতা হচ্ছে খেজুরের রস রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। খেজুরের রসে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে আয়রন,পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ভিটামিন সি, ভিটামিন বি কমপ্লেক্স, মিনারেল ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। ফলে খেজুর রস খেলে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
খেজুরের রস শরীরকে ক্ষতিকর ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ থেকে শরীরকে রক্ষা করে। খেজুরের রস খাওয়ার ফলে শরীর গরম থাকে যার ফলে শীতকালে সর্দি কাশির মতো সমস্যা থেকে মুক্তি মেলে। তাই শরীরে প্রাকৃতিক ইমিউনিটি বাড়াতে খেজুরের রস হতে পারে উপকারী পানীয়।
খেজুরের রস হাড় ও পেশিকে মজবুত করে
খেজুরের রসে রয়েছে প্রচুর পটাশিয়াম, সোডিয়াম ও ক্যালসিয়াম। ফলে খেজুরের রস
খেলে হাড়ও পেশী মজবুত হয়। খেজুরের রস হাড় ও পেশী গঠনে সাহায্য করে। হাড়ের
প্রধান উপাদান ক্যালসিয়াম এর অভাব পূরণ হয় খেজুরের রস খেলে। হাড় ও পেশী
গঠনে ও মজবুত করতে শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ ও গর্ভবতী মহিলাদের জন্য খেজুরের রস
ও খেজুরের রস দ্বারা তৈরি গুড় খুবই উপকারী। তাই প্রতিদিন বিভিন্ন সমস্যা থেকে
মুক্তি পেতে পরিমাণ মতো খেজুরের রস অথবা খেজুরের গুড় খেতে পারি।
ভিটামিনের অভাব দূর করে ও ত্বক ভালো রাখে
খেজুরের রসে রয়েছে ভিটামিন বি কমপ্লেক্স ভিটামিন সি। খেজুরের রসে থাকা ভিটামিন
সি কোষের বর্জ্য পদার্থ দূর করে ও সর্দি কাশি থেকে রক্ষা করে। এছাড়া খেজুরের রস
ত্বককে ভালো রাখে। খেজুরের রসে থাকা প্রাকৃতিক ভিটামিন ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট
ত্বককে সুস্থ রাখে,উজ্জ্বলতা বাড়ায় ও ত্বকে বয়সের ছাপ প্রতিরোধ করে। নিয়মিত
খেজুরের রস খেলে ভিটামিনের অভাব দূর হয়। তাছাড়া খেজুরের রস খেলে রাতে ঘুম ভালো
হয় নিদ্রাহীনতা দূর হয়।
আরও পড়ুনঃ সজিনা পাতা খাওয়ার স্বাস্থ্য উপকারিতা ও পুষ্টিগুণ সম্পর্কে জানুন
ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকে ও রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়
খেজুরের রস ওজন নিয়ন্ত্রণ করে ও রক্তের কোলেস্টরলের মাত্রা কমায়। খেজুরের রস চিনির বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যায়। চিনি যেমন ক্ষতিকর কিন্তু খেজুরের রস ক্ষতিকর নয়। কারণ খেজুরের রসে রয়েছে পর্যাপ্ত পটাশিয়াম যা বিপাক প্রক্রিয়া সহজ করে এতে শরীরে চর্বি জমতে পারে না যার ফলে ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকে। তাছাড়া খেজুরের রস রক্তে খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায় ও ভালো কোলেস্টেরলের মাত্রা ঠিক রাখে যা হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়।
খেজুরের রসের অপকারিতা
খেজুরের রস খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতা সম্পর্কে আলোচনায় এতক্ষণ আলোচনা করলাম খেজুরের রসের উপকারিতা নিয়ে। সবকিছুর যেমন ভালো দিক আছে তেমনি খারাপ দিকও আছে। খেজুরের রসের অনেক উপকারিতা রয়েছে তেমনি এর কিছু অপকারিতা রয়েছে। এখন খেজুরের রসে অপকারিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
খেজুরের রসে সবচেয়ে বড় অপকারিতা হচ্ছে খেজুরের রস খাওয়ার মাধ্যমে নিপা ভাইরাসের সংক্রমণ হয়ে থাকে যা খুবই মারাত্মক। খেজুরের রস যদি সঠিকভাবে সংগ্রহ করা না হয় তাহলে এটি উপকারের বদলে ক্ষতি বেশি করবে। নিপা ভাইরাস বাদুরের মুখে লালা থেকে ছড়িয়ে থাকে। রাতে রস খাবার জন্য বাদুর খেজুরের রসের হাড়িতে যদি মুখ দিয়ে থাকে এবং সেখানে যদি লালা মিশ্রিত হয় তাহলে নিপা ভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তাই সব সময় খেজুরের রস সংগ্রহ করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। খেজুরের রস সংগ্রহ করার ক্ষেত্রে ভালো করে রসের হাড়ি নেট দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। কাঁচা খেজুরের রস খেলে নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে কিন্তু খেজুরের রস যদি জাল দিয়ে খাওয়া হয় তাহলে নিপা ভাইরাস আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা থাকে না। এছাড়াও আরো যেসব অপকারিতা রয়েছে তা হলঃ
- খেজুরের রসে চিনি রয়েছে তাই ডায়াবেটিস আক্রান্ত ব্যক্তি খেজুরের রস খেলে ডায়াবেটিস বেড়ে যেতে পারে।
- যাদের এলার্জি সমস্যা রয়েছে তারা ঠান্ডা খেজুরের রস খেলে সর্দি কাশি,গলা ব্যথা ও শ্বাসকষ্ট বেড়ে যেতে পারে।
- যাদের রক্তের সমস্যা রয়েছে তাদের খেজুরের রস খাওয়া বিপদজনক।
- খেজুরের রস রোদের তাপে অম্ল হয়ে যায় যা খেলে পেটের সমস্যা হতে পারে।
- খেজুরের রস বেশি খেলে ওজন বেড়ে যেতে পারে ও হজম জনিত নানা সমস্যা হতে পারে।
- খেজুরের রস খেলে দাঁতের সমস্যা হতে পারে। দাঁতে ক্যাভিটি সংক্রমণ বেড়ে যেতে পারে।

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url